০৯:৪৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জমি দখলের লোভে নিজের মেয়েকে হত্যা! নেপথ্যে বাবা-মা ও চাচি, এক বছরেও বিচার কার্যকর হয়নি!

  • নিউজ ডেস্ক
  • আপডেট: ১১:৪৬:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
  • ৯৬

জমির লোভ মানুষের বিবেককে কতটা অন্ধ করে দিতে পারে, তার এক নির্মম ও পৈশাচিক উদাহরণ সৃষ্টি হলো কুড়িগ্রামে। প্রতিবেশীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ৩২ বিঘা জমি দখল করার জন্য নিজের ১৫ বছর বয়সী ঘুমন্ত মেয়ে জান্নাতীকে ডেকে নিয়ে কুড়ালের কোপ ও রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে খোদ জন্মদাতা বাবা-মা ও আপন চাচি।

গত বছরের মে মাসে ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পর কুড়িগ্রাম সদর থানা পুলিশের নিবিড় তদন্তে বেড়িয়ে এসেছে এই গা শিউরে ওঠা সত্য। নবম শ্রেণীর মেধাবী শিক্ষার্থী জান্নাতী হত্যার এই ঘটনাটি তখন দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করলেও, বর্তমানে মামলার বিচার প্রক্রিয়া থমকে থাকায় এবং আসামিদের জামিনের চেষ্টার কারণে নিহতের বিচার পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর শঙ্কা।

ঘটনার দিন রাতে প্রতিদিনের মতোই ভাত খেয়ে নিজের রুমে ঘুমিয়েছিল জান্নাতী। পাশের রুমেই ছিল তার বাবা জাহিদুল ইসলাম ও মা মোর্শেদা বেগম। মধ্যরাতের দিকে হঠাৎ বাবা-মা এসে জান্নাতীকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে এবং বাইরে যাওয়ার জন্য জোর করতে থাকে। এত রাতে কোথায় যাবে—মেয়ের এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে তাকে জোর করে ঘর থেকে বের করা হয়।

কিছুদূর যাওয়ার পর জান্নাতী লক্ষ্য করে তার আপন চাচি শাহিনা বেগমও তাদের সাথে যোগ দিয়েছেন। বসতবাড়ির রাস্তা ছেড়ে যখন তারা কৃষি জমির দিকে এগোতে থাকে, তখন জান্নাতীর মনে খটকা লাগে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা একটি ভুট্টা ক্ষেতের কাছে পৌঁছায়। জান্নাতী আবারও তাদের উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করতে গেলে আচমকা পেছন থেকে তার মুখ ও হাত চেপে ধরা হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে লোহার রড দিয়ে জান্নাতীর মাথায় ও শরীরে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। আকস্মিক এই আঘাতে মেয়েটি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে বাবা, মা এবং চাচি শাহিনা বেগম মিলে ধারালো দা দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। নিস্তেজ জান্নাতী তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে একপর্যায়ে ভুট্টা ক্ষেতের মাঝেই মারা যায়। রক্তে ভেসে যায় চারপাশ।

হত্যাকাণ্ড শেষ করে তারা নির্বিকার চিত্তে বাড়ি ফিরে আসে। পরদিন সকালে স্থানীয় কৃষকেরা ভুট্টা ক্ষেতে জান্নাতীর রক্তাক্ত লাশ দেখতে পেয়ে পরিবারকে খবর দেয়। খবর পেয়ে বাবা-মা ঘটনাস্থলে গিয়ে কান্নাকাটির নির্মম নাটক শুরু করে, যাতে কেউ তাদের সন্দেহ না করতে পারে।

এরপর জমি নিয়ে পূর্ব শত্রুতার জেরে প্রতিবেশী ২৭ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন জান্নাতীর বাবা ও চাচা। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সন্দেহভাজন প্রতিবেশীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও ঘটনার কোনো সুরাহা পাচ্ছিল না, কারণ আটককৃতরা সবাই বারবার নিজেদের নির্দোষ দাবি করছিল।

ঘটনার দুই দিন পর জান্নাতীর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও কিছু গোপন ক্লু হাতে পায় পুলিশ। সেই সূত্র ধরে কুড়িগ্রাম সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাবিবুল্লাহ নিহতের বাবা-মা ও চাচা-চাচিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় ডাকেন। থানায় এসেও বাবা-মা প্রতিবেশীদের ফাঁসি দাবি করে নাটক চালিয়ে যেতে থাকেন।

> “প্রতিপক্ষ প্রতিবেশীদের ফাঁসাতেই তারা নিজ মেয়েকে মেরেছে। প্রতিবেশীদের সাথে তাদের একটা ৩২ বিঘা জমি নিয়ে ঝামেলা চলছিল বহু বছর ধরে। তাই চাচি শাহিনা বেগম প্ল্যান দিয়েছিল নিজ মেয়েকে মেরে ওই জমিতে রেখে আসতে, যেন মামলায় প্রতিবেশীদের জেল হলে জমিটা তারা দখল করতে পারে।”

পুলিশের জোরদার জিজ্ঞাসাবাদের মুখে প্রথমে ভেঙে পড়েন চাচি শাহিনা বেগম। তিনি স্বীকার করেন যে শনিবার রাতে তারা তিনজন মিলেই জান্নাতীকে হত্যা করেছেন। শাহিনার স্বীকারোক্তির পর উপায়ান্তর না দেখে বাবা জাহিদুল ইসলাম এবং মা মোর্শেদা বেগমও পুলিশের কাছে নিজেদের সন্তানকে নিজ হাতে খুনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন।

১৫ বছর বয়সী জান্নাতী ছিল স্থানীয় স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী। স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীদের মতে, জান্নাতী পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী এবং স্বভাবে ভীষণ নম্র ও ভদ্র ছিল। বেঁচে থাকলে আজ সে কলেজে পড়তো, হয়তো ভালো ফলাফল করে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতো।

যেখানে পৃথিবীতে একটি সন্তানের জন্য নিঃসন্তান দম্পতিরা হসপিটাল থেকে হসপিটালে ঘুরে বেড়ায়, সেখানে মাত্র ৩২ বিঘা জমির লোভে নিজের কলিজার টুকরাকে এভাবে কুপিয়ে হত্যা করল বাবা-মা!

সবচেয়ে বড় আফসোসের বিষয় হলো, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের এক বছর পার হয়ে গেলেও এখনো কার্যকর কোনো বিচার সম্পন্ন হয়নি। উল্টো ঘাতক বাবা-মা ও চাচি এখন কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার জন্য নামী-দামী উকিল ধরছেন এবং মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করছেন। অন্য কেউ খুন করলে হয়তো বাবা-মা মেয়ের পক্ষে লড়াই করতেন; কিন্তু আজ হত্যাকারী স্বয়ং বাবা-মা হওয়ায়, ওপারে চলে যাওয়া অসহায় জান্নাতীর পক্ষে কথা বলার মতো কেউ নেই। আইনের ফাঁকফোকর গলে আসামিরা পার পেয়ে গেলে তা হবে মানবতার জন্য চরম চড়ামাপের পরাজয়। এলাকাবাসী ও সুশীল সমাজ এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সর্বোচ্চ শাস্তি (ফাঁসি) কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন।

 

ইব্রাহিম খলিল শাওন

সর্বাধিক পঠিত

চাটখিলে তারেক রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে যুবদলের র‍্যালি ও সমাবেশ

জমি দখলের লোভে নিজের মেয়েকে হত্যা! নেপথ্যে বাবা-মা ও চাচি, এক বছরেও বিচার কার্যকর হয়নি!

আপডেট: ১১:৪৬:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

জমির লোভ মানুষের বিবেককে কতটা অন্ধ করে দিতে পারে, তার এক নির্মম ও পৈশাচিক উদাহরণ সৃষ্টি হলো কুড়িগ্রামে। প্রতিবেশীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ৩২ বিঘা জমি দখল করার জন্য নিজের ১৫ বছর বয়সী ঘুমন্ত মেয়ে জান্নাতীকে ডেকে নিয়ে কুড়ালের কোপ ও রড দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে খোদ জন্মদাতা বাবা-মা ও আপন চাচি।

গত বছরের মে মাসে ঘটে যাওয়া এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পর কুড়িগ্রাম সদর থানা পুলিশের নিবিড় তদন্তে বেড়িয়ে এসেছে এই গা শিউরে ওঠা সত্য। নবম শ্রেণীর মেধাবী শিক্ষার্থী জান্নাতী হত্যার এই ঘটনাটি তখন দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করলেও, বর্তমানে মামলার বিচার প্রক্রিয়া থমকে থাকায় এবং আসামিদের জামিনের চেষ্টার কারণে নিহতের বিচার পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর শঙ্কা।

ঘটনার দিন রাতে প্রতিদিনের মতোই ভাত খেয়ে নিজের রুমে ঘুমিয়েছিল জান্নাতী। পাশের রুমেই ছিল তার বাবা জাহিদুল ইসলাম ও মা মোর্শেদা বেগম। মধ্যরাতের দিকে হঠাৎ বাবা-মা এসে জান্নাতীকে ঘুম থেকে ডেকে তোলে এবং বাইরে যাওয়ার জন্য জোর করতে থাকে। এত রাতে কোথায় যাবে—মেয়ের এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে তাকে জোর করে ঘর থেকে বের করা হয়।

কিছুদূর যাওয়ার পর জান্নাতী লক্ষ্য করে তার আপন চাচি শাহিনা বেগমও তাদের সাথে যোগ দিয়েছেন। বসতবাড়ির রাস্তা ছেড়ে যখন তারা কৃষি জমির দিকে এগোতে থাকে, তখন জান্নাতীর মনে খটকা লাগে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা একটি ভুট্টা ক্ষেতের কাছে পৌঁছায়। জান্নাতী আবারও তাদের উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করতে গেলে আচমকা পেছন থেকে তার মুখ ও হাত চেপে ধরা হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে লোহার রড দিয়ে জান্নাতীর মাথায় ও শরীরে উপর্যুপরি আঘাত করা হয়। আকস্মিক এই আঘাতে মেয়েটি মাটিতে লুটিয়ে পড়লে বাবা, মা এবং চাচি শাহিনা বেগম মিলে ধারালো দা দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। নিস্তেজ জান্নাতী তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে একপর্যায়ে ভুট্টা ক্ষেতের মাঝেই মারা যায়। রক্তে ভেসে যায় চারপাশ।

হত্যাকাণ্ড শেষ করে তারা নির্বিকার চিত্তে বাড়ি ফিরে আসে। পরদিন সকালে স্থানীয় কৃষকেরা ভুট্টা ক্ষেতে জান্নাতীর রক্তাক্ত লাশ দেখতে পেয়ে পরিবারকে খবর দেয়। খবর পেয়ে বাবা-মা ঘটনাস্থলে গিয়ে কান্নাকাটির নির্মম নাটক শুরু করে, যাতে কেউ তাদের সন্দেহ না করতে পারে।

এরপর জমি নিয়ে পূর্ব শত্রুতার জেরে প্রতিবেশী ২৭ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন জান্নাতীর বাবা ও চাচা। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে সন্দেহভাজন প্রতিবেশীদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও ঘটনার কোনো সুরাহা পাচ্ছিল না, কারণ আটককৃতরা সবাই বারবার নিজেদের নির্দোষ দাবি করছিল।

ঘটনার দুই দিন পর জান্নাতীর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট ও কিছু গোপন ক্লু হাতে পায় পুলিশ। সেই সূত্র ধরে কুড়িগ্রাম সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাবিবুল্লাহ নিহতের বাবা-মা ও চাচা-চাচিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় ডাকেন। থানায় এসেও বাবা-মা প্রতিবেশীদের ফাঁসি দাবি করে নাটক চালিয়ে যেতে থাকেন।

> “প্রতিপক্ষ প্রতিবেশীদের ফাঁসাতেই তারা নিজ মেয়েকে মেরেছে। প্রতিবেশীদের সাথে তাদের একটা ৩২ বিঘা জমি নিয়ে ঝামেলা চলছিল বহু বছর ধরে। তাই চাচি শাহিনা বেগম প্ল্যান দিয়েছিল নিজ মেয়েকে মেরে ওই জমিতে রেখে আসতে, যেন মামলায় প্রতিবেশীদের জেল হলে জমিটা তারা দখল করতে পারে।”

পুলিশের জোরদার জিজ্ঞাসাবাদের মুখে প্রথমে ভেঙে পড়েন চাচি শাহিনা বেগম। তিনি স্বীকার করেন যে শনিবার রাতে তারা তিনজন মিলেই জান্নাতীকে হত্যা করেছেন। শাহিনার স্বীকারোক্তির পর উপায়ান্তর না দেখে বাবা জাহিদুল ইসলাম এবং মা মোর্শেদা বেগমও পুলিশের কাছে নিজেদের সন্তানকে নিজ হাতে খুনের লোমহর্ষক বর্ণনা দেন।

১৫ বছর বয়সী জান্নাতী ছিল স্থানীয় স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী। স্কুলের শিক্ষক ও সহপাঠীদের মতে, জান্নাতী পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী এবং স্বভাবে ভীষণ নম্র ও ভদ্র ছিল। বেঁচে থাকলে আজ সে কলেজে পড়তো, হয়তো ভালো ফলাফল করে পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতো।

যেখানে পৃথিবীতে একটি সন্তানের জন্য নিঃসন্তান দম্পতিরা হসপিটাল থেকে হসপিটালে ঘুরে বেড়ায়, সেখানে মাত্র ৩২ বিঘা জমির লোভে নিজের কলিজার টুকরাকে এভাবে কুপিয়ে হত্যা করল বাবা-মা!

সবচেয়ে বড় আফসোসের বিষয় হলো, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের এক বছর পার হয়ে গেলেও এখনো কার্যকর কোনো বিচার সম্পন্ন হয়নি। উল্টো ঘাতক বাবা-মা ও চাচি এখন কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার জন্য নামী-দামী উকিল ধরছেন এবং মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করছেন। অন্য কেউ খুন করলে হয়তো বাবা-মা মেয়ের পক্ষে লড়াই করতেন; কিন্তু আজ হত্যাকারী স্বয়ং বাবা-মা হওয়ায়, ওপারে চলে যাওয়া অসহায় জান্নাতীর পক্ষে কথা বলার মতো কেউ নেই। আইনের ফাঁকফোকর গলে আসামিরা পার পেয়ে গেলে তা হবে মানবতার জন্য চরম চড়ামাপের পরাজয়। এলাকাবাসী ও সুশীল সমাজ এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সর্বোচ্চ শাস্তি (ফাঁসি) কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন।

 

ইব্রাহিম খলিল শাওন